সোমবার ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ২০:১৭
রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মি হলে হযরত খাদিজা (সা.আ.) কীভাবে তাঁকে বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব দিয়েছিলেন?

পবিত্র কুরআনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ‘উম্মি নবী’ বলা হয়েছে। এখানে ‘উম্মি’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি কোনো মানবীয় শিক্ষক বা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে পড়া-লেখা শেখেননি। তবে উম্মি হওয়া মানেই জ্ঞানহীন বা কোনো কিছু বুঝতে অক্ষম হওয়া নয়। তাহলে প্রশ্ন হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) যদি উম্মি হয়ে থাকেন, তবে তিনি কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং হযরত খাদিজা (সা.আ.) কেন তাঁকে নিজের বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব দিয়েছিলেন?

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ‘উম্মি’ শব্দটির অর্থ ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যবসায়িক দক্ষতা নিয়ে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে শব্দটির প্রকৃত অর্থ বুঝতে হবে।

‘উম্মি’ শব্দটির দুটি ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো, শব্দটি ‘উম্ম’ অর্থাৎ ‘মা’ থেকে উদ্ভূত। এ অর্থে উম্মি এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি জন্মের সময় যেমন ছিলেন, তেমনি কোনো মানবীয় শিক্ষকের মাধ্যমে পড়া-লেখা শেখেননি। অপর একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শব্দটি ‘উম্মুল কুরা’ তথা মক্কা নগরীর সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে কুরআনের ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিবেচনায় ‘উম্মি’ শব্দের প্রথম অর্থটিই অধিক প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে কুরআনের ‘যারা কিতাব সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না’—এ ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে এ অর্থের সামঞ্জস্য রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পড়া-লেখা না করা এবং পড়তে-লিখতে অক্ষম হওয়া এক কথা নয়। কোনো ব্যক্তি পড়াশোনা বা লেখালেখির চর্চা না করলেও তার অর্থ এই নয় যে, সে পড়তে বা লিখতে সক্ষম নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্ষেত্রে ‘উম্মি’ শব্দটি নিয়ে আলোচনায় এ পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:

‘আর আপনি এর আগে কোনো কিতাব পাঠ করতেন না এবং নিজ হাতে তা লিখতেনও না।’ —সূরা আল-আনকাবুত, ৪৮

এই আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কিতাব পড়া বা নিজ হাতে লেখার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু তিনি পড়তে বা লিখতে আদৌ সক্ষম ছিলেন না—এমন কথা আয়াতটি সরাসরি বলে না।

শাইখ তুসি (রহ.) তাঁর আত-তিবইয়ান ফি তাফসিরিল কুরআন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.) পড়তে বা লিখতে অক্ষম ছিলেন—এমন বক্তব্য নেই; বরং কুরআন নাজিলের আগে তিনি এ ধরনের কাজ করতেন না—এ বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। আল্লামা তাবাতাবাঈ (রহ.)-ও আয়াতের প্রকাশ্য অর্থের সঙ্গে এ ব্যাখ্যাকে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেছেন।

এখন প্রশ্ন আসে, যদি ‘উম্মি’ বলতে পড়া-লেখার প্রচলিত শিক্ষা না পাওয়া বোঝানো হয়, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা.) কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতেন?

বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য শুধু পড়া-লেখা জানা যথেষ্ট নয়। ব্যবসায় সফলতার জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণতা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, লাভ-ক্ষতির বিচার, বাজার সম্পর্কে ধারণা, সততা ও আমানতদারিতা। বিশেষ করে সে সময়ের ব্যবসাব্যবস্থা বর্তমান সময়ের মতো লিখিত নথি ও জটিল হিসাব-নিকাশের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল না।

রাসূলুল্লাহ (সা.) নবুয়ত লাভের আগেই তাঁর সততা, আমানতদারিতা, বিচক্ষণতা ও বিশ্বস্ততার জন্য মক্কার মানুষের কাছে সুপরিচিত ছিলেন। এ কারণেই হজরত খাদিজা (সা.আ.) তাঁর ওপর আস্থা রেখে নিজের বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন।

সুতরাং ‘উম্মি’ হওয়া এবং দক্ষ ব্যবসা পরিচালনার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। একজন ব্যক্তি প্রচলিত মানবীয় শিক্ষাব্যবস্থায় পড়া-লেখা না শিখেও বিচক্ষণ, দক্ষ ও সফল ব্যবস্থাপক হতে পারেন।

এ ছাড়া ‘উম্মি’ শব্দকে জ্ঞানহীনতা বা কোনো ধরনের অপূর্ণতার সঙ্গে সমার্থক করাও সঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) মানবীয় কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ করেননি—এটি তাঁর জ্ঞান ও মর্যাদাকে অস্বীকার করে না। বরং ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহ তাঁকে বিশেষ জ্ঞান ও পূর্ণতা দান করেছেন। এ বিষয়টি ‘ইলমে লাদুন্নি’—অর্থাৎ আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ জ্ঞানের আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ কারণে ‘উম্মি’ শব্দের অর্থকে কেবল ‘জ্ঞানহীন’ বা ‘অক্ষম’ হিসেবে গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব ও কুরআনের বক্তব্যের প্রকৃত তাৎপর্য স্পষ্ট হয় না।

বরং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরে। তিনি কোনো মানবীয় শিক্ষকের কাছ থেকে কুরআনের শিক্ষা লাভ করেননি এবং কুরআন নাজিলের আগে প্রচলিত অর্থে কোনো কিতাব পাঠ বা লিখনচর্চাও করেননি। এরপরও তাঁর মাধ্যমে এমন এক কিতাব মানবজাতির কাছে পৌঁছেছে, যার ভাষা, জ্ঞান, হিদায়াত ও গভীরতা অনন্য। এটি কুরআনের ঐশী উৎসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) যদি উম্মি হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি আরবি কবিতা কীভাবে জানতেন বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবিতার পঙ্‌ক্তি কীভাবে উদ্ধৃত করতেন?

এর উত্তর হলো, কবিতা জানা বা মুখস্থ করার জন্য পড়তে-লিখতে জানা আবশ্যক নয়। সে সময় আরব সমাজে কবিতা মূলত মৌখিকভাবে প্রচার ও সংরক্ষিত হতো। মানুষ শুনে শুনে দীর্ঘ কবিতা মুখস্থ করত এবং অন্যদের কাছে তা বর্ণনা করত।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:

‘আমি তাকে কবিতা শিক্ষা দিইনি এবং তা তার জন্য শোভনীয়ও নয়।’ —সূরা ইয়াসিন, ৬৯

অতএব কোনো কবিতার পঙ্‌ক্তি জানা বা উদ্ধৃত করা মানেই কবি হওয়া নয়। একইভাবে কবিতা মুখস্থ বা শ্রুতির মাধ্যমে জানা ‘উম্মি’ হওয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ‘উম্মি’ বলা হয়েছে বলে তাঁর ব্যবসায়িক দক্ষতা, বিচক্ষণতা বা জ্ঞান নিয়ে কোনো অসঙ্গতি তৈরি হয় না। ‘উম্মি’ শব্দকে মানবীয় শিক্ষাব্যবস্থায় পড়া-লেখার শিক্ষা না পাওয়ার অর্থে বুঝলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। হজরত খাদিজা (সা.) তাঁর ওপর বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন তাঁর অসাধারণ সততা, আমানতদারিতা, বিচক্ষণতা ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার কারণে। তাই ‘উম্মি’ হওয়া এবং দক্ষ ব্যবসা পরিচালনার মধ্যে কোনো প্রকৃত বিরোধ নেই।

তথ্যসূত্র: ১. শাইখ তুসি, আত-তিবইয়ান ফি তাফসিরিল কুরআন, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২১৬

২. আল্লামা তাবাতাবাঈ, আল-মিজান ফি তাফসিরিল কুরআন, খণ্ড ১৬, পৃষ্ঠা ১৩৯।

৩. মুহাম্মদ হাদি মারেফাত, উলুমে কুরআনি, পৃষ্ঠা ৩২।

৪. পবিত্র কুরআন, সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৬৯।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha